মানুষ গড়ার কারিগর


             সবেমাত্র ৪র্থ শ্রেনীর বার্ষিক ফলাফল ঘোষনা হলো, আমি এইবার ২য় স্থান এবং খেলায় ১ম স্থান অধিকার করাতে প্রফূল্ল চিত্তে বাবার কাছে এসে হাজির হলাম। ভাবলাম বাবা নিশ্চয় বেশ খুশি হবে তার গুনধর ছেলে এই মহা সাফল্যে। কিন্তু বিধি মনে হয় উপরে বসে মুকচি হাসছিলেন, বাবা আমার কান টা জোরে মলে দিয়ে হংকার ছেড়ে দিয়ে বললেন হারামজাদা পড়ালেখায় ফার্স্ট হতে পারলিনা না। প্রতিটি স্কুলে একটা দুষ্টের দল থাকে, ভাগ্যগুনে এই দলটা আমাদের শ্রেনীতেই ছিল। যার ফলে ৫ম শ্রেনীতে ক্লাস করার ১ মাসের মাথায় প্রধান শিক্ষক এ কে এম ফজলুল হক সাহেব আমাদের শ্রেনী কক্ষ পরিবর্তন করে উনার অফিস কক্ষের নিকটে যে শ্রেনী কক্ষটি রয়েছে , তার পাশে আমাদের অবস্থান ঠিক করে দিল। স্কুলের সিনিয়র দল হওয়ার পরও আমাদের কোন কার্যক্রম চালাইতে পারছি বিধায় দল টারে একটু অপমান করার সুযোগ নিতে লাগলো মেয়ে গ্রুপ। কুট কথা শুনতে শুনতে আমাদের কান ঝালা পালা হতে লাগলো আর মনের ভিতরের রাগের মিটারে কাটা দিনকে দিন বাড়তে লাগলো। এর মধ্যে হঠাৎ আমাদের প্রধান শিক্ষক এসে ঘোষনা করলেন আগামী সপ্তাহে একটা দেয়ালিকা তৈরি করা হবে , এতে যেন আমরা গল্প, কবিতা, ছড়া কৌতুক দিয়ে অংশগ্রহন করি । আমি মহা উৎসাহে একখানা ছড়া হেডস্যারকে নিয়ে লিখলাম এবং হেডস্যার আসা মাত্র তা উনার হাতে দিলাম ( স্যার এ প্রতিদিন আমাদের শ্রেনী কক্ষে একবার এসে মনিটর করে যেত, যেন আমরা তার ভয়ে ভীত হয়ে থাকি)। “ ছড়া খানা পড়িয়া স্যারের মুখখানা অতি উজ্জল হইয়া উঠিল এবং ততখানা একখানা কলম দিয়া আমাকে পুরস্কারে ভুষিত করিল। সেদিন হতে আমার কাব্য প্রতিভা সারা স্কুলে ছড়িয়া পড়িল এবং আমার এই সাফল্যে নিচের ক্লাসের সবাই ছড়া লিখতে বেশ উৎসাহিত হইয়া পড়িল , কিন্তু ক্লাসের মেয়ে গ্রুপ গুলা টিপ্পনী যেন দ্বিগুন বাড়িয়া গেল। “ এতে আমাদের একটু অপমানিত বোধ হত লাগলো । সবাই মিলে ঠিক করলাম এই সব বালিকাগুলারে একটু শিক্ষা দিতে হবে। পরদিন ক্লাসরুমে একটু তাড়াতাড়ি এসে মেয়েদের বসার স্থানে বিশেষ একটা বুস্তুর উপরি ভাগ ছিটিয়ে দিলাম। ক্লাস শুরুর আধাঘন্টা পরেই হলো তার এ্যাকশন। মেয়েদের মধ্যে দেখলাম একটা অস্থিরটা শুরু হলো , খালি চুলকাচ্ছে, আর আমাদের দিকে তাকালেই, আমরা মুচকি মুচকি হাসছি । এতে করে আর বালিকা গ্রুফের বুঝতে বাকি রইল না এই কর্ম কারা করছে। যথারীতি হেডস্যারের আগমন, তবে খালি হাতে না সাথে একখান ডান্ডা হাতে ( বেত না , বেতের চাইতেও একটা হেডি বড় একটা লাঠি), ডান্ডা দেখে আমাদের রক্তে একটা হিমশীতল হাওয়া বয়ে গেল। হেড স্যার হংকার ছেড়ে বলল বান্দার হোলা কেন এই খানে ছড়িয়েছে। ক্লাশে পিন পতন নীরবতা, কারো মুখো কোন সাড়া শব্দ নাই, কেউ একুট নড়ে চড়ে না। কারো কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে আসাদের দলের সবাইকে একে একে সামনে ডেকে নিলো এবং ডান্ডাটা দিয়ে বলল এটা কি। আমরা ভয়ে ভয়ে মুখ হতে উচ্ছারন করলাম , স্যার বেত, স্যার বলল না এর নাম বাবাজি , যে একবার এর দর্শন পেয়েছে সারা জীবনের জন্য ভালো হয়ে গেছে। বুঝলাম আজকে আর কেউ বাচাঁতে পারবে না। সবার সামনে আমাদের দলটারে বেশ ভালো করে বাবাজির দর্শন করালো। এ ঘটনার পর যতদিন অত্র স্কুলে ছিলাম ততদিন আমাদের গ্রুপ ওয়ার্ক বন্ধ থাকলো। প্রাথমিক স্কুলের পাঠি চুকিয়ে এইবার হাইস্কুলে ভর্ত্তি হলাম। আগের গ্রুপের কেউ আর আমার সাথে নেই। তাই প্রথম দিন ক্লাসে আনমনা হয়ে ম্যাডামের দেওয়া বুকলিস্ট একাগ্রচিত্তে দেখছি, কখন যে ম্যাডাম বলল, সবাই বুক লিস্ট যার যার ব্যাগে রেখে দাও তা আমার কানে প্রবেশ করলো না। ম্যাডাম আমাকে ডাক দিয়ে বলল , তুমি এদিকে আস, আমি উনার সামনে গেলাম, ফির বলল, আরো কাছে আসো, আমিও বেশ কাছে এসে দাড়ালাম, হঠাৎ উনি কষে একটা চড় আমার গালে দিলেন। পুরো ক্লাস নীরব হয়ে গেল। ক্লাসের সবাই প্রথম দিনেই ম্যাডেম সর্ম্পকে একটা ভালো ধারনা নিয়ে নিল। আসি বাসায় এসে লক্ষ্য করলাম, আমার গালে পাচটি লাল রেখা উকি মারছে। ৭ম শ্রেনীতে থাকা কালে, প্রাথমিক স্কুলের মতো ধীরে ধীরে হাই স্কুলেও একটা গ্রুপ গড়ে উঠলো। শ্রেনী শিক্ষক , জনাব শফিকুর রহমান। যার শাস্তি দেওয়ার স্টাইল ছিল কানের পাশে অবস্থিত মাথার চুল গুলো টেনে তুলে ফেলার প্রচেস্টা। তো এই স্টাইল ই ৭ম শ্রেনীর শেষের দিকে থাকা কালে পাল্টিয়ে গেল, তাও আমাদের গ্রুপেরই মহান কর্মের জন্য। সিনেমা হল স্কুল হতে ১ ঘন্টার পথ, ঐ সময় নতুন একটা ঝাকানাকা দৃশ্যের ছবি সমেত আমিন খানের অবুঝ দুটি মন ছবি রিলিজ হলো। সবাই ঠিক করলাম টিফিন ছুটিতে পালিয়ে সিনেমাটা দেখে আসবো। যথারীতি দলের সবাই ছবিটি দেখে এলাম। পরদিন ক্লাসে এসে বসে সিনেমা নিয়ে গল্প করছি, শফিক স্যার হাতে এক জোড়া বেত নিয়ে প্রবেশ করলেন এবং বাড়ির কাজের খাতা গুলি জনে জনে চেক করলেন। কিন্তু আমাদের কারো মাথায় আর ডুকছে না এই হস্তশাস্তির পরিবর্তে স্যারের হাতে বেত কেন। কোন ভাবেই মিলাতে পারলাম না । বাড়ির কাজ চেক করা শেষে একে একে আমাদের দলের সবাইকে সামনে ডাকলো এবং লাইন ধরে দাড়াতে বলল। স্যার প্রশ্ন করলো গতকাল টিফিনের পরে ক্লাসে না এসে কোথায় গিয়ে ছিলাম। একেক জন একেক কথা বললাম। স্যার বলল সত্যটা বলো ( স্যার কিভাবে যেন জেনে গিয়েছিল আমাদের মহান কর্মের কথা)। কেউ আর কোন কিছু বলছি না। এবার স্যার একটা চিৎকার করে বলল, গতকাল তোমরা অবুঝ হয়ে গেছিলে, আজ আমি অবুঝ হয়ে যাবে। সেই অবুঝ মাইর খেয়ে তিনদিন স্কুলে গেলাম না। এনামুল হক স্যার। বেশ ভালো মনের এক আত্মভোলা মানুষ। কোন ছাত্রের (গরীব) বেতন আটকে গেলে আমরা দেখেছি স্যার তা মাফ করে দিতেন, সুযোগটা আমরা কাজে লাগাতাম বেতনের টাকা খেয়ে ফেলতাম এবং স্যারকে এসে বলতাম আমার বাবা এই মাসের মাইনে পাই নাই, স্যার আমরা খুব গরীব মানুষ , কিংবা ইংরেজীতে সাময়িক পরীক্ষায় ৩০ বা ৩১ নম্বার পেলে, স্যারকে গিয়ে একুট অনুয় বিনয় করলেই তিনি তা পাস মার্ক করে দিতেন, কিংবা এমনও দেখা গেছে পরীক্ষায় রচনা কমন পরে নাই, সবাই স্যারকে ধরে অনুরোধ করলেই তিনি জার্নি বাই বুট লিখতে ঘোষণা করে দিতেন । এতো ভালো একজন স্যারকে সবাই কেন জানি গরু স্যার ( ক্ষমা পূর্বক) বলে ডাকতো। তার রহস্য কিছু দিনের মধ্যেই উদ্বঘাটিত হলো। তাও এই রহস্য আবিস্কার করলাম স্বংয় আমি। ঘটনা ৮ম শ্রেনীতে থাকা কালে, তিনি ছিলেন আমাদের শ্রেনী শিক্ষক, তিনি আমাদের ইংরেজী গ্রামারের ক্লাস নিতেন। রোল কল করার পর তিনি বললেন গতকাল কি রচনা মুখস্ত করতে বলেছিলাম, সবাই একবাক্যে বলে উঠলাম জার্নি বাই বুট। স্যারে কেন জানি এই রচনারটার একটা বিশেষ দূর্বলতা ছিল। আগের দিন কি রচনা ছিল তা কোন বড় বিষয় না, জার্নি বাই বুট আজকের রচনা এটাতেই উনার এক ধরনের তৃপ্তি চলে আসতো। উনার একটা সমস্যা ছিল প্রথম দুটি লাই্ন এবং শেষের লাইটটা ভালো করে শুনতো বাদ বাকি মাঝের লাইনে কি বলছি তা তিনি শুনতো না, কেমন জানি আনমনা হয়ে যেত। আমরা সবাই এই সুযোগটা নিতাম পড়া বলার সময়। আমাকে ডাকলো , দেখি তুই ডেসকারাইপশনটা বল, যথারীতি প্রথম দুই লাইন ভালো করে বলল এবং মাঝে কি সব বলা কওয়া শেষে শেষের লাইটা সঠিক ভাবে বলে শেষ করলাম। স্যার শেষ, বলে স্যারের মুখের দিকে তাকালাম। স্যার কিছু না বলে আমারে পিঠে শুরু করলো উত্তম-মাধ্যম। সে কি মাইরে বাবা, চাষী যে ভাবে তার অবাধ্য গরু ধরে মারে, আমাকেও সেইভাবে রাম ধোলাই লাগলো, বলতে লাগলো “আমার সাথে ফাকিবাজিঁ, হ্যাঁ তুই মাঝের অংশে কি সব বকাবকি করছিলি।“ পরদিন স্কুলে গেলাম, শরীরের তাপমাত্রা বেশ উপরের দিকে। লাস্ট বেঞ্জ এ এসে মাথানিচু বসে আছি। স্যার প্রবেশ করলো, আমাকে ডাক দিলেন, কাছে আসতেই স্যার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে লাগলেন আর বলতে লাগলেন তোরা আমার সন্তান, তোদের মারলে আমার খুব কস্ট লাগে, বাবারা তোরা আর এই রকম দুষ্টামী করিছ না। স্যারের দিকে মাথা তুলে মুখের দিকে তাকালাম, দেখি উনার চোখ থেকে জল গুলো গড়িয়ে পড়ছে।

2 Responses to “মানুষ গড়ার কারিগর”

  1. nadim Says:

    আরে ভাই জবর লিখছেন,আমার অন্তরের অন্তরস্তল থেকে ধন্যবাদ।


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: