ঢোল, দু প্রান্তে মারি বারি


সে অনেক দিন আগের কখা। ফটিক চন্দ্র ( ছ্দ্ম নাম) আর্ট কলেজ এ পড়ছে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আলপনা করে দেওয়ার জন্য তার ছিল বিশাল খ্যাতি। বিজয় দিবস উপলক্ষে নেতাজী আগের রাতে ( ছদ্মনাম, তখনও আমার এই বন্ধু রাজনৈতিক অঙ্গনে এতটা পরিচিত হয়ে ইঠে নাই) ডাক দিল ফটিক কে । বাস্তায় একটি আলপনা এবং কিছু চিকা মারতে হবে। তো নেতাজীর এহেন কর্মে আমাদেরও দেশ দরদের মন উথলে উঠল। আমি আর আমার ডিজাইনার বন্ধু ( সে তখনও ডিজাইনর হয়নি, তবে ম্যাচের কাঠি, সিগারেট এর প্যাকেট আরো কত কি দিয়ে যেন কিতারা কিতারা ডিজাইন বানাতো) ঠিক করলাম আমরা এতে অংশ নিবো। ফটিক চন্দ্র মন দিয়ে রাস্তায় আলপনার কাজ করে যাচ্ছে , আর আমি এবং ডিজাইনার দু জন মিলে গাড়ি থামিয়ে কাজের প্রিন্ট করা একটা করে দেশের পতকা লাগিয়ে দিচ্ছি। নেতাজীকে দেখলাম আমরা যে গাড়িতে পতাকা লাগাচ্ছি , সে সেই গাড়ীর ড্রাইভার হতে কিছু টাকা চাদা তুলছে। দেখলাম কোন ড্রাইভারই খালি হাতে ফিরিয়ে দিচ্ছে না। এ দিকে ফটিক এর কাজ প্রায় শেষ আর আমাদেরও পতকা শেষ হয়ে আসছে। কারো আসলে তখন নেতাজীর কথা মনে নেই। হঠাৎ ফটিক এসে বলল দোস্ত কাজ শেষ, নেতাজী কই। আমি আর ডিজাইনার সহ চারদিকে চোখ বুলিয়ে খোজতে লাগলাম। নাহ নেতাজীর কোন হদিস নেই। আমি বললাম যাকগা , আমাদের কাজ তো শেষ। ঠিক তখনই ডিজাইনার চেচিয়ে বলল, “হালায় চাদার সবগুলো টাকা মাইরা দিলো।” এ ঘটনার পর হতে নেতাজীর সাথে আর দেশ উদ্ধার করতে একিত্র হয় না। নেতাজীর সাথে কম চলতে লাগলাম , যার যার কাজ কর্ম নিয়ে ধীরে ধীরে ক্যারিয়ার গঠনে সচেস্ট হতে লাগলাম।
এ বছরের প্রথম দিকে আমি তখন দেশে। এর মধ্যে অনেক সময় পার হয়ে গেছে। ফটিক চন্দ্র বিয়ে করেছে, এখন আর আলপনা, চিকা মারে না। ডিজাইনার বেশ ভাল একটা চাকুরী ঝুটিয়ে নিয়েছে। বড় কোম্পানীর ডিজাইন এন্ড প্রিন্টং কাজ গুলি এখন তার হাত দিয়ে হয়। নেতাজী এলাকার যে কোন সমস্যায় উপস্থিত থাকে। সেই সময় মাত্র নতুন সরকার দেশ পরিচালনা শুরু করেছে। নেতাজী ছিল বিরোধী দলীয় আর্দশে বিশ্বাসী। ঈদে হঠাৎ ডিজাইনের বাবা অসুস্থ হয়ে গেল। বিকালে আমি, ডিজাইনার এবং নেতাজী তিন জন মিলে উনাকে দেখার জন্য জি ই সি এর মোড়ে ক্লিনিকে দেখতে গেলাম। কিছুক্ষন সময় অতিবাহিত হওয়ার পর বের হয়ে আসলাম, উদ্দেশ্য ঘরে ফিরে যাবো। নেতাজী বলল দোস্ত কাছেই মেহেদীবাগ ঐ খানে আমার বস( এক সময় কার বানিজ্য মন্ত্রী) থাকে চল পাচঁ মিনিটে একটু দেখা করে আসি। রাজি হয়ে গেলাম। এসে দেখি নেতার বাড়ীতে এলাহি কাজ কারবার , চট্টগ্রামের যত আতি-পাতি নেতা আছে সব উনাকে ঘিরে বসে আছে। জীবনে এই প্রথম কোন প্রথমসারীর নেতার সাথে সরাসরি দেখা এবং কোলাকুলি হল। আহ, নিজেকে ধন্য মনে করতে লাগলাম আর মনে মনে নেতাজীর প্রসংশা করতে লাগলাম। কিছুক্ষন পড়ে দেখি ঐতিয্যবাহী মেজবানী খানা। নেতাজীর সাথে আমরা বসে পড়লাম। এই সময় নেতাজী তার সহযোদ্ধাদের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিল। নেতাজী এর মাঝে চুপিসারে আমাদের জানিয়ে দিল আমি যে দুই বাচ্চার বাপ তা যেন এখানে ফাস করা না হয়, কারণ আমি ছাত্র নেতা! শেষ পর্যন্ত প্রায় দেড় ঘন্টায় পাচঁ মিনিট শেষ হলো। সি এন জি স্কুটার নিতে চাইলে নেতাজী বাধা দিয়ে বলল পথে সুগন্ধা ঐ খানে আমার আরেক বস থাকে, বিশ্বাস কর শুধু কোলাকুলি করেই চলে আসবো। ভাবলাম পেট তো ভরা, আচ্ছা যাক না । সাথে করে আমার ঐ নেতার বাসায় প্রবেশ করলাম। কোলাকলি এবং পরিচয় পর্ব শেষ করে যেতে চাইলেও যেতে দিচ্ছে না, ঈদের দিন কেউ কি আর খালি মুখে বিদায় নিতে পারে। বসে পড়লাম। দেওয়ালের দিকে চোখ পড়তেই আমার চোখ ছানাবড়, না , না না, আমি একি দেখছি এ কার ছবি। না এ হতে পারে না। এ দেখি শেখ মুজিবের ছবি। যে নেতা জিয়ার আর্দশে বিশ্বাসী সে কিনা এই মুজিব সেনার বাসায়।
হিসাব মিলাতে পারলাম না। সি এন জি স্কুটারে বসে শুধু ভাবছি। মনে পড়ছে, ঢোল , আমি দেখেছি এই বাদ্যযন্ত্রটি দু ধরেন হয়। এক পিঠ ওয়ালা, আরেকটি হল দু পিঠ ওয়ালা। ঢুলিকে দেখতাম দু পিঠের ঢোলকে কাধে ঝুলিয়ে দু হাতে দুদিকে বারি মারছে , আর কি সুন্দর টাকডুম টাকডুম আওয়াজ করছে। আমার এই নেতা বন্ধুটি সেই ঢুলি হয়ে রাজনীতি নামক ঢোল এর দু দিকে কি সন্দুর করে বারি মারছে, আমার মধুর সুর তুলে জনগনকে সেবা করে যাচ্ছে।
————-একসাষে প্রকাশিত হলঃ http://www.microqatar.com/?p=121

2 Responses to “ঢোল, দু প্রান্তে মারি বারি”

  1. Nirmalya B. Says:

    sundor… satiric… ebong satire er dhormo onusare khNocha gulo-w achhe… chaliye jan.

    amar blog e apnar sador amontron roilo. kemon laglo janale khushi hobo. bhalo thakben.🙂

  2. microqatar Says:

    অনেক ধন্যবাদ আপনার স্ন্দর মন্তব্যের জন্য।
    আপনার সাইট টা দেখলাম। আপনি দেখি বেশ ভাল কবিতা লিখেন।


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: